বৃহস্পতিবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২১ ১৮ই অগ্রহায়ণ ১৪২৮
 
শত কোটি টাকা যেভাবে হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারক চক্র
প্রকাশ: ০৪:১২ pm ২৬-১০-২০২১ হালনাগাদ: ০৪:২৬ pm ২৬-১০-২০২১
 
 
 


রাজধানীর পল্লবী থেকে কর্ণফুলী মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাকিল আহমেদসহ মোট ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার (২৬ অক্টোবর) র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং থেকে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

জানানো হয়, র‍্যাব-৪ এর একটি টিম তাদের গ্রেপ্তার করে। প্রতারণার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এই প্রতিষ্ঠান।

মোজাম্মেল হক বলেন, সোমবার (২৫ অক্টোবর) থেকে মঙ্গলবার (২৬ অক্টোবর) সকাল পর্যন্ত মিরপুর অভিযান পরিচালনা করে কর্ণফুলী মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড এর চেয়ারম্যানের অন্যতম সহযোগী এবং প্রকল্প পরিচালক মো. শাকিল আহম্মেদসহ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে অভিযানকালে সভাপতি জসিমসহ সমিতির কার্যকরি কমিটির অন্যান্য সদস্যরা পালিয়ে যায়।

তিনি বলেন, শাকিল ছাড়া গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন চাঁন মিয়া, এ কে আজাদ, তাজুল ইসলাম, শাহাবুদ্দিন খাঁন, আব্দুস ছাত্তার মো. মাসুম বিল্লা, টিটু মিয়া ও আতিকুর রহমান। এ সময় প্রতারণায় ব্যবহৃত ১৭টি মুদারাবা সঞ্চয়ী হিসাব বই, ২৬টি চেক বই, ২ ডিপোজিট বই, ৩টি সিল, ১২০টি ডিপিএস বই, ১টি রেজিস্টার বই, ১টি নোটবুক, ১টি স্যালারি শিট, ৩০টি জীবন-বৃত্তান্ত, ৫টি ক্যালেন্ডার, ৮ পাতা ডিপিএস এর মাসিক হিসাব বিবরণী, ৩টি পাসপোর্ট, ১টি ডিভিআর মেশিন, ভুক্তভোগীদের অভিযোগ কপি জব্দ করা হয়।

র‌্যাব-৪ অধিনায়ক বলেন, প্রতারণার নতুন নতুন কৌশল ব্যবহার করে সাধারণ জনগণকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এক শ্রেণির পেশাদার প্রতারক চক্র।  সম্প্রতি মাল্টিলেভেল মার্কেটিং (এমএলএম), ই-কমার্স, সমবায় সমিতি, এনজিও, অনলাইন ব্যবসার মাধ্যমে অসংখ্য মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে সর্বশান্ত করার বেশকিছু অভিযোগ পেয়েছে র‌্যাব। এসব প্রতারকদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে বেশকিছু সফল অভিযানও পরিচালনা করা হয়েছে। পলাতক আসামি জসিম উদ্দিনের বাড়ি মুন্সীগঞ্জ। সে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স পাস করে।  তার ২ স্ত্রী এবং ২ পুত্র সন্তান রয়েছে। আগে একটি ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে রিপ্রেজেন্টিটিভ হিসেবে কর্মরত ছিল। 

তিনি বলেন, ২০০৩ সালে সে অল্প সময়ে অধিক মুনাফা লাভের আশায় কর্ণফুলী মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লি. প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু সমবায় অধিদপ্তরের নিবন্ধন লাভ করে ২০০৬ সালে এবং ২০১৩ সালে সমিতিটির পুনর্নিবন্ধন হয়। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ২০১৮/২০১৯ সালের তাদের মোট সদস্য সংখ্যা ৫৩৭ জন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে নিয়ম বহির্ভূতভাবে ২৫-৩০ হাজার সদস্য গ্রাহক সংগ্রহ করেছে। সে কোম্পানিতে নতুন নতুন সদস্য নিতে পুরনো সদস্যদের চাপ দিতো এবং তাদের মুনাফার লোভ দেখাতো।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, কর্ণফুলী মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লি. এর আনুমানিক ২৫-৩০ হাজার গ্রাহক রয়েছে। যারা ডিপিএস ও এফডিআর এর মাধ্যমে বিনিয়োগ করেছে এবং যার পরিমাণ আনুমানিক শত কোটির বেশি বলে অনুসন্ধানে জানা যায়। টাকা চাইতে গেলে গ্রাহকদের হুমকি ধামকি, মারধর করা ও মামলার ভয় দেখানো হতো। জসিমের নির্দেশে গ্রেপ্তারকৃত শাকিল ও চাঁন মিয়া ভুক্তভোগীদের মারধরসহ শারিরীক ও মানসিক নির্যাতন করতো।  আর ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাকিল আহম্মেদ টঙ্গী কলেজ থেকে অনার্স পাস করে।  তার ১ স্ত্রী এবং ১ কন্যা সন্তান রয়েছে। ২০১৫ সালে কর্ণফুলী মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লি. এর প্রকল্প পরিচালক হিসেবে যোগদান করে। শাকিল যোগদান করার পর থেকে গ্রাহকের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। সে অত্যন্ত সুচারুভাবে গ্রাহকদের লোভনীয় অফার দিয়ে সমিতিতে ডিপিএস/এফডিআর এ টাকা রাখতে প্রলুব্ধ করত।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এই প্রতারক চক্রের মাঠ পর্যায়ের কর্মী/সদস্য রয়েছে। তারা রাজধানীর মিরপুরে বিভিন্ন বস্তি এলাকার গার্মেন্টসকর্মী, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, অটোচালক, সবজি ব্যবসায়ী, ফল ব্যবসায়ী, গৃহকর্মী ও নিম্ন আয়ের মানুষদের টার্গেট করে স্বল্প সময়ে মাসিক মেয়াদ শেষে অধিক মুনাফা লাভের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের কোম্পানিতে বিনিয়োগ, ডিপিএস করতে চেষ্টা করত। গ্রাহককে প্রলুব্ধ এবং তথ্য সংগ্রহ করে ভুলিয়ে নানান কৌশলে প্রতারক চক্রের অফিস কার্যালয়ে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা হতো।  প্রতি গ্রাহক/টার্গেট সংগ্রহের জন্য নির্দিষ্ট অংকের টাকা দেওয়া হতো।  প্রতিষ্ঠানে কেউ যদি একটি ডিপিএস মাসে ১ হাজার টাকা করে বছরে ১২ হাজার টাকা জমা দেয় তবে পাঁচ বছরে ৬০ হাজার টাকা জমা হবে।  মেয়াদ শেষে তাকে ৯০ হাজার  টাকা দেওয়া হবে এবং টার্গেট সংগ্রহকারী ব্যক্তি প্রথম ১ বছর প্রতি মাসে ২০০ টাকা এবং পরবর্তী ৪ বছর প্রতি মাসে ১০০ টাকা করে লভ্যাংশ পাবে। আবার কোম্পানির কোন সদস্য যদি নতুন কোন সদস্যকে ১ লাখ টাকার এফডিআর করাতে পারে তাহলে টার্গেট সংগ্রকারীকে মাসে ১ হাজার টাকা এবং এফডিআরকারী সদস্যকে মাসে ২ হাজার টাকা দেওয়ার প্রলোভন দিত। প্রকৃতপক্ষে যা বাংলাদেশে কোন আর্থিক প্রতিষ্ঠান দিতে পারে না।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, কোম্পানির কিছু সদস্য মাসিক, পাক্ষিক ভিত্তিতে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে ডিপিএস এর টাকা সংগ্রহ করত। ভুক্তভোগীদের বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখানো হতো যদি তারা যদি সময়মত ডিপিএস এর টাকা না পরিশোধ করে তাহলে মেয়াদ শেষে তারা মুনাফা কম পাবে এবং নিয়মিত টাকা না দিলে জরিমানাও করা হতো। অধিক মুনাফার লোভে ভুক্তভোগীরা সঠিক সময়ে ডিপিএস এর টাকা জমা করত, এমনকি করোনাকালীন সময়েও খেয়ে না খেয়ে কস্ট করে সমিতিতে নিয়মিত টাকা প্রদান করে আসছে পক্ষান্তরে কোন লভ্যাংশ পায়নি।

 

 
 

আরও খবর

 
 
 
 
 
 
 
 
©newsofbd24.com